১০ আগস্ট ২০২২ ২৩:৪৯:৪২
logo
logo banner
HeadLine
১২ সিটিতে শুরু হচ্ছে ৫-১১ বছরের শিশুদের করোনার টিকাদান * জ্বালানি নিরাপত্তা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান * সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি * চাওয়া-পাওয়া বিলাসিতাই জীবন নয়: প্রধানমন্ত্রী * বঙ্গমাতার জীবন থেকে সারা বিশ্বের নারীরা শিক্ষা নিতে পারে : প্রধানমন্ত্রী * শেখ কামালের নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে যুব সমাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মর্যাদাকে সমুন্নত করবে : প্রধানমন্ত্রী * চীনের সামরিক মহড়ায় অবরুদ্ধ তাইওয়ান * শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র জোরদার হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী * সমুদ্র বন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত * শত প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে এই উন্নয়ন, একে অব্যাহত রাখতে হবে : প্রধানমন্ত্রী * হাইকোর্টে ১১ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ * সরকার তরুণদের দক্ষ কর্মশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে : প্রধানমন্ত্রী * হিজরী নববর্ষ কাল * মিরসরাইয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত * অগ্রযাত্রা থামবে না - প্রধানমন্ত্রী *
     28,2022 Thursday at 08:48:25 Share

চ্যালেঞ্জ জয়ে স্বপ্ন পূরণ, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আজ

চ্যালেঞ্জ জয়ে স্বপ্ন পূরণ, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আজ

কাওসার রহমান :: স্বপ্ন এখন সত্যি। এদেশের মানুষ দীর্ঘ সাত বছর ধরে যে স্বপ্ন দেখছিল, পদ্মা নদীর ওপরও সেতু হবে, সেই স্বপ্ন এখন আর স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। পুরো জাতির স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে আজ। সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন। উদ্বোধন হচ্ছে আজ শনিবার সকাল ১০টায়। শেষ হচ্ছে অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর। যে স্বপ্ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদীশাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন, তাঁর হাত দিয়েই আজ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। এর সকল কৃতিত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাই তো আজ উৎসবে মাতবে সারাদেশ। পদ্মাপাড়ের উৎসবে জেগে উঠবে সারাদেশের মানুষ। আর এ সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে একটি মাইলফলক রচিত হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে পদ্মা সেতুর মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশাল প্রতিবন্ধকতার পথে হাঁটতে হাঁটতে ঠিকই তিনি গন্তব্যে পৌঁছেছেন। সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের জাল দৃঢ়তার সঙ্গে ছিন্ন করে তিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই তো পদ্মা সেতু আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতা আর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সাহসের প্রতীক। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিশ্ব আরও একবার বাংলাদেশের সক্ষমতা জানার সুযোগ পেল।

পদ্মা সেতু আজ আর শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি এখন বাঙালী জাতির গর্ব, আত্মমর্যাদা ও অহঙ্কারের প্রতীক। এই সেতু নির্মাণের ফলে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নদীবেষ্টিত ভূখ- সরাসরি রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। ফলে এই সেতু যেমন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সুবাতাস বয়ে আনবে, তেমনই কমপক্ষে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ জাতীয় আয় বৃদ্ধিও নিশ্চিত করবে। লাভবান হবে গোটা দেশের মানুষ। প্রসার হবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণে এই সেতু বিরাট ভূমিকা রাখবে।

পদ্মা সেতু নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও একবার উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। এই সেতুর নাম ‘শেখ হাসিনা সেতু’ করার জন্য দলের পক্ষ থেকে প্রবল দাবি উঠেছিল। সেতু বিভাগ থেকেও একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে, সেখানে ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন জায়গায় এমনকি সংসদেও দাবি উঠেছিল, পদ্মা সেতুর নাম শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করার। কিন্তু দূরদর্শী নেত্রী শেখ হাসিনা তা নাকচ করে দেন। গত এক যুগ ধরে যত আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক সবই হয়েছে পদ্মা সেতু ঘিরে। ফলে বিশ্বে এই সেতুটি পদ্মা সেতু নামেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব দাবি নাকচ করে দিয়ে ‘পদ্মা সেতু’ নামেই সেতুর নামকরণের নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৪ মে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদ্মা নদীর নামেই সেতুর নামকরণ করা হবে।’ গত ২৯ মে পদ্মা সেতুর নাম চূড়ান্ত করে সেতু বিভাগের উন্নয়ন অধিশাখা থেকে গেজেট জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেতু বিভাগের অধীন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের’ আওতায় মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা প্রান্ত সংযোগকারী পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি সরকার ‘পদ্মা সেতু’ নামে নামকরণ করলেন। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

জমকালো উদ্বোধন ॥ বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর, তা শেষ হয়েছে ২০২২ সালের ২২ জুন। সব কাজ শেষ করে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ঠিকাদার সেতুটি গত ২২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে সেতু কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। টেকিংওভার সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে এদিন পদ্মা সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে সেতু কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হয়। এরই মধ্যে সেতুটির উদ্বোধনের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সাড়ে তিন হাজার সুধীজনকে। এ তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা। এদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, ড. ইউনূস এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দও রয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে আইনগত কারণে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে দাওয়াত দেয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকাল ১০টায় মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশ করে পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। এরপর তিনি ম্যুরাল ও নামফলক উন্মোচন করে টোল দিয়ে সফরসঙ্গীদের নিয়ে গাড়িতে করে পদ্মা সেতু পার হবেন। ওপারে গিয়েও প্রধানমন্ত্রী আরও একটি ম্যুরাল ও নামফলক উন্মোচন করবেন। উদ্বোধন কার্যক্রম শেষ করে প্রধানমন্ত্রী দুপুরে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল জনসভায় ভাষণ দেবেন।

সেতু বিভাগ জানায়, সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের জন্য ইতোমধ্যে ম্যুরাল ও ফলক নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ৪০ ফুট উচ্চতার দুটি ম্যুরাল নির্মিত হয়েছে। দুটি ম্যুরালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি রয়েছে।

ইতোমধ্যে শিবচরে ঐতিহাসিক জনসভা আয়োজনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের এই জনসভাকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকারী দল আওয়ামী লীগ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সারাদেশের মানুষ যাতে এই আনন্দ উৎসবে অংশ নিতে পারে সেজন্য দেশের ৬৪ জেলায় এই অনুষ্ঠান একযোগে রেপ্লিকেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেলা ৩টায় শিবচরের কাঁঠালবাড়িতে আয়োজিত ঐতিহাসিক জনসভাটি শুরু হবে। এ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও দিনব্যাপী সেখানে থাকছে নানা আয়োজন। এসব আয়োজনে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছে ক্ষমতাসীন দলটি।

পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রবল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী জনসভায়ও সারাদেশের মানুষ যুক্ত হয়ে যাবে। সেভাবেই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়ছে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বোঝা যায় শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের জনসভায় সারাদেশের মানুষ এক হয়ে যাবে।

বহুল কাক্সিক্ষত স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনে ব্যাপক জনসমাগম ঘিরে যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সেতুর উভয় পাড়ে নেয়া হয়েছে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পদ্মার দুই পাড়েই শুধু পাঁচ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ইউনিফর্মে মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকে তৎপর রয়েছে আরও বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্য। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সেতুর দুই পাড়েই খোলা হযছে পুলিশের বিশেষ কন্ট্রোল রুম। সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। সেতু সংলগ্ন পদ্মা নদী ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গত ২১ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা এবং মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতু উত্তর থানার উদ্বোধন করেছেন। অনুষ্ঠান স্থলে পদ্মা নদীতে নৌ পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলেরও অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একটি মহল নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কিছু ঘটিয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাতে পারে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ কারণে পুলিশ সদর দফতর থেকে সারাদেশের প্রতিটি থানায় নির্দেশ পাঠানো হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার জন্য। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ যাতে গুজব ছড়াতে না পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক সাইবার মনিটরিং করা হচ্ছে।

সেতুর আজ উদ্বোধন হলেও সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চলাচল করছে না। উদ্বোধনের পর ২৬ জুন সকাল ৬টা থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে নিয়মিতভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারবে। সেভাবেই সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বাস চলাচলের জন্য কোম্পানিগুলো প্রস্তুতি নিয়েছে। এই রুটে চলাচলের জন্য লাক্সারি সব বাস নামানোর জন্য বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণে মূলত তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর চ্যালেঞ্জগুলো ছিল রাজনৈতিক, কারিগরি এবং পরিবেশগত। এর মধ্যে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ খুব ঠা-া মাথায় অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে মোকাবেলা করেছেন স্বয়ং প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর কারিগরি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন এদেশে বিজ্ঞানীরা। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থায়ন থেকে সরে গেলে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দেখভাল ও তদারকির জন্য দায়িত্ব পড়ে এদেশের ভৌত ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ওপর। যারা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে পরামর্শ দিয়ে চীনা ঠিকাদারকে সহায়তা করেছেন এই সেতু নির্মাণে।

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ॥ পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক। ২০১২ সালে হঠাৎ করেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে গেলে এই চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। এই চ্যালেঞ্জের সরাসরি সম্মুখীন হন আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে দুই ধরনের প্রতিকূলতার মুখে পড়েন তিনি। এক পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা এবং দ্বিতীয়ত দুর্নীতির অভিযোগ সামাল দেয়া। খুব ঠা-া মাথায় তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রেও তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।

পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। বিশ্বব্যাংক এগিয়ে আসায় এ সেতুর অর্থায়নে জাপানের জাইকা, আইডিবি ও এডিবি এগিয়ে আসে। ফলে ১৮ মে জাইকার সঙ্গে, ২৪ মে আইডিবির সঙ্গে এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থায়ন চুক্তির পর ওই বছরেরই (২০১১ সাল) সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তোলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। অথচ তখন সেতু প্রকল্পের কাজ শুরুই হয়নি। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল কানাডার পরামর্শক সংস্থা এসএনসি লাভালিন কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রী, সেতু সচিব, সেতু প্রকল্পের পিডি ও অন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছে। তারা জোর দাবি করে তাদের কাছে দুর্নীতির যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ আছে।

বিশ্বব্যাংক এই দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কথিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিতে থাকে। তারা মন্ত্রী, সচিব, পিডি ও অন্যদের সেতুর কাজ হতে অব্যাহতি চায়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠায় সরকার কি ব্যবস্থা নিয়েছে তা সরেজমিনে দেখার জন্য। ওই প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে দুদকের সঙ্গে সভা করেন। এ সময় দেশের গণমাধ্যমও উঠেপড়ে লাগে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য। শুরু করে নানা অপপ্রচার।

এভাবে বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত চাপ, মিডিয়ার প্রপাগান্ডা এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও কিছু সুশীল সমাজের লোকের বক্তৃতা-বিবৃতি এবং কোন কোন গবেষণা সংস্থার কর্মকর্তাদের কথায় এমন আবহ তৈরি হয় যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে সত্যিই দুর্নীতি হয়েছে! সরকার কোন পদক্ষেপ না নিলে মনে হবে সরকার দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে চাচ্ছে। এগুলো মূলত পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এবং এদেশে যাতে পদ্মা সেতু না হয় তার জন্য।

বাধ্য হয়ে সরকার বিশ্বব্যাংক উত্থাপিত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তদন্ত করে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংকের চাপে তৎকালীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে ইস্তফা দিতে বললে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দেন। সচিব মোশারফ হোসেন ভুঁইয়াকে বদলি করা হয়। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান টিম গঠন করে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিতেই দুদক সাতজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে। সেই মামলায় সচিব মোশারফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ৪০ দিন জেল খাটেন। পরবর্তীতে দুদকের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আদালত আসামিদের খালাস দেয়।

বাংলাদেশ সরকার এত সকল ব্যবস্থা নিলেও বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হয়নি। তারা ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ঋণচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা করে। তখন বিশ্বব্যাংককে অনুসরণ করে জাইকা, এডিবি ও আইডিবিও তাদের নিজ নিজ ঋণচুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংক কানাডার এসএনসি লাভালিনকে ১০ বছরের জন্য ব্যাংকের কাজে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কানাডার একটি আদালতে এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর কানাডার আদালত অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে মামলা খারিজ করে দেয় এবং অভিযুক্তরা খালাস পায়। কারণ বিশ্বব্যাংক কানাডার আদালতে দুর্নীতির কোন তথ্য প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাংক নিজেও তদন্ত করে দুর্নীতির পক্ষে কোন সাক্ষ্য প্রমাণ পায়নি। কানাডার আদালতে এবং বাংলাদেশের দুদকের তদন্ত দলের কাছে বিশ^ব্যাংক কোন সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। অথচ তারা বলেছিল তাদের কাছে যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ আছে। আসলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ইমেলে বেনামে বিশ্বব্যাংকের কাছে অভিযোগপত্র পাঠিয়েছিল। সেই ব্যক্তিরাও দুর্নীতির তথ্য প্রমাণের কোন ডকুমেন্ট দিতে পারেনি। ফলে বিশ্বব্যাংকের তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ শেষ পর্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। ২০১৭ সালে বিশ^ ব্যাংক আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক প্রসিকিউটর আর্জেন্টিনার আইনজীবী লুইস গেব্রিয়েল মরেনো ওকামপোকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা দেখার জন্য। বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কথিত দুর্নীতির অভিযোগকে প্রমাণ করতে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি ঘোষণা দেন পদ্মা সেতু অবশ্যই হবে। তবে তা বিশ্বব্যাংকের টাকায় নয়, নিজস্ব অর্থায়নেই হবে। তিনি বলেন, ‘অন্যের কাছ থেকে হাত পেতে টাকা এনে পদ্মা সেতু করব না। আমাদের জনগণের টাকায়ই পদ্মা সেতু নির্মিত হবে।’

বিশ্বব্যাংক চলে গেলে চীন অবশ্য পদ্মা সেতু নির্মাণে ঋণ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। চীন প্রস্তাব দিয়েছিল, বিওটি অর্থাৎ বিল্ড ওন ট্রান্সফার পদ্ধতিতে দুইশ’ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই প্রস্তাবও গ্রহণ করেননি। তিনি পণ করেন, দেশের জনগণের টাকায় পদ্মা সেতু নির্

User Comments

  • জাতীয়