১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৯:৬:১৩
logo
logo banner
HeadLine
মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি - প্রধানমন্ত্রী * জনগণের আস্থায় যেন ফাটল না ধরে, সজাগ থাকতে হবে * কাল রাজশাহী যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী * এসএমই খাতে ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ছে * আওয়ামীলীগে শুদ্ধি অভিযান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী দুই শতাধিক নেতাকে পাঠানো হচ্ছে শোকজ * আমরা কৃষিকেও গুরুত্ব দেই, আবার শিল্পকেও গুরুত্ব দেই - শেখ হাসিনা * বেপরোয়া রোহিঙ্গারা, প্রশাসনিক এ্যাকশন শুরু * স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারী কোষাগারে জমা দিতে হবে * সরকারের মানবিকতাকে দুর্বলতা ভাবা উচিত নয় * 'বাকশাল হলে বাংলাদেশ আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকতো' - প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা * আসামে চূড়ান্ত নাগরিকত্ব তালিকা থেকে বাদ পড়ল ১৯ লাখ * অপকর্মে লিপ্ত থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ৪১ এনজিও প্রত্যাহার * জটিল হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা সমস্যা * দেশের প্রতিটি গ্রামকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে - প্রধানমন্ত্রী * ৫ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকার ১২টি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন * বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দেড় কোটি টাকা * আইভি রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর মিলাদ মাহফিলে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী * বেপরোয়া রোহিঙ্গারা, পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ২ * ২ বছরে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের ব্যয় ৭২ হাজার কোটি টাকা! * আবারও ভেস্তে গেল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া * গ্রেনেড হামলায় খালেদার মদদ ছিল,মৃত্যু ভয়ে আমি কখনই ভীত ছিলাম না, এখনও নই * নারকীয় গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী আজ, আওয়ামীলীগকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এ হামলা * ২২ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু * ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১,৬১৫ জন, কমছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা * জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রথমবারের মতো পালিত হলো জাতীয় শোক দিবস * ডেঙ্গু দমন নিয়ে অসন্তোষ হাইকোর্ট * সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু * ডেঙ্গুর কার্যকর ওষুধ ছিটাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও দুই মেয়রকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ , নাগরিকদেরকে তাদের বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি * সরকারী হাসপাতেলে বিনামূল্যে, বেসরকারীতে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি বেঁধে দিয়েছে সরকার * ডেঙ্গু জ্বর: প্রতিরোধের উপায় *
     01,2019 Sunday at 13:23:22 Share

সরকারের মানবিকতাকে দুর্বলতা ভাবা উচিত নয়

সরকারের মানবিকতাকে দুর্বলতা ভাবা উচিত নয়

আবদুল মান্নান :: মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ও বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিককে নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে যে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তা মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে দুই বছর ধরে আসা প্রায় সাত লাখ আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলমান (হিন্দু, খ্রিস্টানরাও আছে) আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। এই দুই বছরে সেই সাত লাখ আরাকানি রোহিঙ্গা প্রায় ১৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিতি লাভ করেছেন। এই রোহিঙ্গারা কয়েক শ বছর ধরে আরাকান প্রদেশে বসবাস করছে (আগের নাম রাখাইন প্রদেশ)। বলে নেওয়া ভালো, আরাকান কখনো মূল মিয়ানমারের অংশ ছিল না। এটি একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং একসময় মুসলমান রাজারাই আরাকান শাসন করতেন। এই রাজ্যের সীমানা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পরবর্তীকালে আরাকান রাজ্য মিয়ানমারের শাসক দখল করে ও রাজাকে বিতাড়িত করে। ১৮২৪ সালে ব্রিটিশরা মিয়ানমার দখল করে এবং তারা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তা তাদের দখলে রাখে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার আগে যখন জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন, তখন আরাকানে একটি মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল এবং তার নেতারা আরাকানকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছিলেন, যা জিন্নাহ তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশরা মিয়ানমারকে স্বাধীনতা দেওয়ার সময় আরাকান রাজ্যও তাদের দিয়ে দেয়। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আরাকানের মুসলমানরা শান্তিতেই ছিল। সংকট শুরু হলো যখন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই দেশের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, তখন তাদের ঘোষিত নীতিই ছিল মিয়ানমারে মৌলবাদী (থেরোবাদী) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছাড়া আর কোনো ধর্মের মানুষ থাকতে পারবে না, ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা তো নয়ই। তখন থেকেই শুরু মিয়ানমারে জাতিগত উচ্ছেদ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, প্রথম টার্গেট আরাকানের অধিবাসীরা। সে সময় মিয়ানমারে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের যত ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল সব সামরিক সরকার বাজেয়াপ্ত করে। ১৯৬২ সালে প্রথম রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীরা চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। তখন পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছে। সে সময় সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। তার পর থেকে নিয়মিত বিরতি দিয়ে আরাকান থেকে সেখানে বসবাসকারী অধিবাসীদের উচ্ছেদ শুরু হয়। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অন্যান্য প্রদেশের খ্রিস্টান ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে সেই দেশে শুরু হয় নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। গড়ে ওঠে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ। এই মুহূর্তে ৯টি সশস্ত্র গ্রুপ মিয়ানমারে সক্রিয় আছে। ১৭টি যুদ্ধবিরতি করছে। ২২টির কোনো কর্মকাণ্ড নেই। এদের মধ্যে দুটি ছিল আরাকানিদের। প্রথমটা আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (আরিফ) আর দ্বিতীয়টা মুজাহিদিন। এরা শুরু থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিল।


২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে কমনওয়েলথ ও ব্রিটিশ ফরেন অফিসের আমন্ত্রণে আমার সুযোগ হয়েছিল লন্ডনে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করার। সেমিনারের মূল বিষয় ছিল ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উগ্র জঙ্গিবাদ’  (Religious Tolerance and Violent Extremism)। প্রায় ২০টি দেশের প্রতিনিধি সেই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। একটি সেশন ছিল রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনার জন্য। সেখানে লন্ডনে বসবাসরত এক রোহিঙ্গা নেতাও উপস্থিত ছিলেন, তবে তাঁর  কাছে হালনাগাদ কোনো তথ্য ছিল না। আমার সময় ছিল ১৫ মিনিট। উঠেই বললাম, অচিরেই আরাকানে নতুন করে রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু হবে বলে সব আলামত বলছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী আর মৌলবাদী বৌদ্ধদের অপতৎপরতা বন্ধ করার জন্য যদি দ্রুত আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা না হয়, তাহলে খুব অল্প দিনের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সে দেশ থেকে আবার নতুন করে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো শুরু করবে। যদিও প্রাথমিক ধাক্কা বাংলাদেশকে সামাল দিতে হবে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সময়ে তা মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন সব দেশের জন্য এক ভয়াবহ নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করবে, যার সব লক্ষণ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। ২০১৩ সালে মিয়ানমারের আদি রাজধানী ইয়াঙ্গুনে অন্য আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। এই সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ‘গণতন্ত্র ও স্বাধীন গণমাধ্যম’। উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি সংস্থা। মিয়ানমারের ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে এই আয়োজন। আমার সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত আর সোহরাব হাসান। সেই দেশের নোবেল লরিয়েট অং সান সু চি সব অংশগ্রহণকারীকে এক দিন মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তিনি উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আমরা তিনজন তাঁর খুব কাছেই বসেছিলাম। শ্যামল দত্ত অনেক চেষ্টা করেও অং সান সু চির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হন। পরে শ্যামল বেশ উচ্চৈঃস্বরে বলেন ‘ম্যাডাম, আমি আপনার পাশের দেশ বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার একটা প্রশ্ন ছিল।’ এ কথা শোনার পর সু চি সভা সেখানেই শেষ করে দেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না তিনি রোহিঙ্গা নিয়ে কোনো আলোচনা করতে মোটেও উৎসাহী নন। বর্তমান সংকটের জন্য সু চি তাঁর দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না।  


২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নতুন উদ্যমে রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু করে। রোহিঙ্গাদের পক্ষে নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা অনেক সহজ। প্রথমে শত শত, পরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়া ও কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নেয়। সেখানে আগে থেকেই আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবির ছিল। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয় অনেকটা মানবিক কারণে। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এক কোটি শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের মানুষ সে সময় আমাদের দেশের উদ্বাস্তুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজেদের খাবার ভাগাভাগি করে খেয়েছিলেন, যদিও সে সময় ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিল না। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের শরণার্থীদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ৪৬ বছর পর রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি একই সহমর্মিতা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা যদি ১৬ কোটি মানুষকে অন্ন জোগাতে পারি, তাহলে সাত লাখ মানুষকেও খাওয়াতে পারব; প্রতি মাসে এই বিপুলসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীর ভরণপোষণ করতে বাংলাদেশকে তিন শ মিলিয়ন ডলার বা আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। শুরুতে অনেকে এদের জন্য খয়রাতি সাহায্য দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও এ পর্যন্ত বাংলাদেশ তার সিকি ভাগ পেয়েছে মাত্র। বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থী দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে এসেছিল; কিন্তু যখন থেকেই রোহিঙ্গারা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আসা শুরু করেছে (১৯৬২) তাদের কেউই আর ফিরে যেতে উৎসাহ বোধ করেনি। কারণ বাংলাদেশে তারা যে আরামের জীবনযাপন করছে, তা তাদের পক্ষে মিয়ানমারে পাওয়া অকল্পনীয় ছিল। একাত্তরে বাঙালিদের সঙ্গে তাদের আর একটি তফাত হচ্ছে—একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করে নিজেদের দাবি আদায় করতে পেরেছিলাম, যা রোহিঙ্গাদের পক্ষে নানা কারণে সম্ভব হয়নি। তারা অনেকটা তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও স্বার্থের শিকার হয়েছে। 


২০১৩ সালে ইয়াঙ্গুনের সেই সম্মেলনে পরিচয় হয়েছিল বিখ্যাত সুইডিশ সাংবাদিক বার্টিল লিন্টনারের (Bertil Lintner) সঙ্গে। একসময় তিনি প্রখ্যাত সাপ্তাহিক ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর (অধুনালুপ্ত) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংবাদিক ছিলেন। লিন্টনার এ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ওপর প্রচুর গবেষণা করেছেন। মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ওপরও লিখেছেন প্রচুর। থাকেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই শহরে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর লিন্টনার রংপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তিনি টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন এবং রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা তাঁকে একটি রোহিঙ্গা অস্ত্র ট্রেনিং ক্যাম্পে নিয়ে যান। তিনি অবাক হয়ে দেখেন সেখানে যত না রোহিঙ্গা ট্রেনিং নিচ্ছে, তার চেয়েও বেশি ট্রেনিং নিচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্যাডার বাহিনী। তিনি একজনের সাক্ষাৎ পান, যে ইন্দোনেশিয়ার সুলেভেশি দ্বীপ থেকে এসেছে। পরবর্তীকালে লিন্টনার এসব বিষয় নিয়ে ‘The Great Game East’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সেদিন লিন্টনার আমাকে বলেছিলেন, হয়তো এখন মিয়ানমারসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো বুঝতে পারছে না খুব নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারা কত ভয়ংকরভাবে তাদের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে; যখন পারবে, তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। গত রবিবার উখিয়ার কুতুপালংয়ে প্রায় পাঁচ লাখ (কোনো কোনো সংবাদপত্রের মতে সাত লাখ) রোহিঙ্গার সমাবেশ এবং সেখান থেকে নানা ধরনের হুঙ্কার একটি অশনিসংকেতের আলামত। তার এক দিন পরই ক্যাম্পের ভেতরে এক কামারের কাছে ধরা পড়েছে সাড়ে ছয় শ ধারালো অস্ত্র। কোনো এক এনজিও নাকি তাদের এ ধরনের ছয় হাজার অস্ত্র তৈরির অর্ডার দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের আরবরা ইউরোপ থেকে আসা ইহুদিদের তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছিল। আজ সেই আরবরা নিজেরাই উদ্বাস্তু। পরিস্থিতি এখনই সামাল দিতে না পারলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা বিষয়টি আরো জটিল হতে বাধ্য।


রোহিঙ্গারা এত সাহস কোথায় পায়? অবশ্যই এই সাহসের পেছনে আছে স্থানীয় কিছু ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতা, আছে এনজিওগুলোর প্রত্যক্ষ মদদ এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দুর্বলতা। গত বৃহস্পতিবারের সমাবেশ সম্পর্কে নাকি প্রশাসন কিছুই জানত না। এটা কী বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে? রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ১২৩টি এনজিও কাজ করে, যার মধ্যে পাকিস্তানিসহ মোট ২১টি বিদেশি এনজিও আছে। দেশীয় আছে ১০২টি, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হচ্ছে জামায়াতের মতবাদে দীক্ষিত। এখানে মাদরাসা শিক্ষার নামে দেওয়া হচ্ছে ধর্মান্ধতার তালিম। পাকিস্তানি এনজিওগুলো সরাসরি জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত, যেমন আল-খিদমাত ফাউন্ডেশন, তেমনটা খবর দিয়েছে দেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল। অন্যান্য এনজিওর কর্মকর্তারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ চেষ্টা করছে বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে সমাধান করতে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে; কিন্তু জাতিসংঘ আগের ধারাবাহিকতায় একটি নপুংসক সংস্থার পরিচয় দিয়েছে। বিশ্বমোড়লদের অনেকেই এসে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে বাহবা দিয়েছেন; কিন্তু কেউ ঘোষণা দেননি তাঁরা সঙ্গে করে কিছু রোহিঙ্গা নিজ দেশে নিয়ে যাবেন।


সার্বিক বিচারে এখন মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে এই সমস্যা বাংলাদেশকেই সমাধান করতে হবে এবং তা করতে হবে কূটনৈতিক উপায়ে। ২০১৬ সালে সু চি গঠিত জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিটি প্রণীত চার দফা বাস্তবায়ন করলেই সমস্যার সমাধান অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তবে তার আগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকে সম্পূর্ণরূপে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউএনএইচসিআর, আইওএম, রেডক্রসের মতো সংস্থা ছাড়া শিবির থেকে বের করে দিতে হবে সব ধরনের এনজিওকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সরকার এনজিওগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াবে। এমনটি করা নানা কারণে সহজ নয়। প্রতিটি ক্যাম্পের ভেতরে স্থাপন করতে হবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা চৌকি। রাতের বেলায় ক্যাম্পের বাইরে জারি করতে হবে কারফিউ। ভেতরে বসাতে হবে পর্যাপ্তসংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা আর ফ্লাড লাইট। একসময় ডা. ইউনুস নামের একজন রোহিঙ্গা নেতা ছিলেন, যিনি এই অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করতে রোহিঙ্গাদের উসকানি দিতেন। বর্তমানে দিচ্ছেন মহিবুল্লাহ নামের একজন। এই ব্যক্তি আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দরবারে গিয়েও হাজির হয়েছেন। লাখ টাকার প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের পাসপোর্ট কিভাবে পেলেন? প্রতি মাসে শ শ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যাচ্ছে এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। যার ফলে বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশিদের। রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশের ভেতরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একটি অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে। সেই আঁতাত জরুরি ভিত্তিতে ভাঙতে হবে।


বলা হয়, চারটি দেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে এ সমস্যার সমাধান সহজ হবে। এর মধ্যে আছে রাশিয়া, ভারত, জাপান ও চীন। এই চারটি দেশের মধ্যে প্রথম তিনটি বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই তিনটি দেশের  অবদান এ দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এদের কাছে কূটনৈতিক পর্যায়ে আরো বেশি জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে হবে। চীন একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাবসায়িক স্বার্থ জড়িত আছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত আছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে এই দুই দেশের সীমান্তের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে বাধ্য। সব শেষে রোহিঙ্গাদের কঠোর ভাষায় বুঝিয়ে দিতে হবে, তারা যতই হুমকি-ধমকি দিক, তারা একটি স্বাধীন দেশে আশ্রিত। তাদের পেছনে বাংলাদেশ প্রতি মাসে আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করে। এই টাকা দেশের জনগণের টাকা। তাদের হাত বাংলাদেশ নামের দেশটির হাত থেকে লম্বা হতে পারে না। সময় থাকতে সরকার যদি উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের অবস্থা ফিলিস্তিনের আরবদের মতো হতে পারে।


লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক ( কালের কণ্ঠে প্রকাশিত)।

User Comments

  • কলাম