২৬ মে ২০২০ ১০:১৩:১০
logo
logo banner
HeadLine
যুক্তরাষ্ট্রে পিপিই রপ্তানি শুরু করলো বাংলাদেশ * ২৫ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৯৭৫, মৃত ২১ * ২৪ মে : চট্টগ্রামে আরও ৬৫ জনের করোনা শনাক্ত * আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা * করোনায় মারা গেলেন এনএসআই কর্মকর্তা সন্দ্বীপের নাছির উদ্দিন * সন্দ্বীপবাসীকে পবিত্র ইদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানালেন মেয়র * ২৪ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৫৩২, মৃত ২৮ * করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলবে সরকারি সহায়তা, জীবন-জীবিকার স্বার্থে চালু করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড - প্রধানমন্ত্রী * সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা * ২৩ মে : চট্টগ্রামে নতুন শনাক্ত ১৬৬ * করোনাকালীন সঙ্কটে পড়া সন্দ্বীপ পৌরসভার কর্মহীনদের বরাবরে সরকারের দেয়া ২৫০০ টাকা ছাড় শুরু * ২৩ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৮৭৩, মৃত ২০ * বিদায় মাহে রমজান, আজ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা * হালদায় ১৪ বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড, ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম সংগ্রহ * ২২ মে : চট্টগ্রামে নতুন শনাক্ত ১৬১ * সন্দ্বীপ পৌরসভার জাটকা আহরণে বিরত জেলেদের মাঝে চাল বিতরণ * ২২ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৬৯৪, মৃত ২৪ * এসএসসির ফল ৩১ মে * ঈদে বাইরে ঘোরাফেরা নয়, ঘরেই থাকুন: র্যা ব ডিজি * ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ * সন্দ্বীপ পৌরসভার কর্মহীন অসহায় মানুষদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ইদ উপহার বিতরণ * ২১ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৭৭৩, মৃত ২২ * বায়তুশ শরফের পীরের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন * দুর্বল হয়ে পড়েছে আম্পান, বন্দরসমূহে ৩ নং স্থানীয় সতর্ক সংকেত * করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন বায়তুশ শরফের পীর ছাহেব * দুর্বল হয়ে পড়ছে 'আম্পান', উপকূলীয় কিছু এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ,নিহত অন্তত ৭ * ২০ মে : চট্টগ্রামে নতুন শনাক্ত ২৫৭ * ২০ মে : দেশে আজ শনাক্ত আরও ১৬১৭, মৃত ১৬ * পশ্চিমবংগের সাগরদ্বীপ ও সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে উপকূলে আঘাত হানতে শুরু করেছে আম্ফান * সন্দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় ঘুর্ণিঝড় সতর্কতায় মেয়র টিটুর মাইকিং *
     17,2020 Sunday at 17:15:16 Share

শেখ হাসিনার একার লড়াই: ইতিহাসের নেপথ্যে থাকা কিছু তথ্য

শেখ হাসিনার একার লড়াই: ইতিহাসের নেপথ্যে থাকা কিছু তথ্য

স্বদেশ রায় :: এই করোনাকালে (কোভিড-১৯) শেখ হাসিনাকে একাই লড়তে হচ্ছে। তবে এই একা লড়া তার জীবনে প্রথম নয়। বরং সারা জীবন দলে ও দলের বাইরে তাকে মূলত একাই লড়তে হয়েছে। আর এই লড়াইয়ের শুরু তার ছাত্র রাজনীতির জীবন থেকেই। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন ছাত্রী অবস্থা থেকেই শুরু। দেশে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ছাত্রলীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনা দুঃখ করে বলেছিলেন, তিনি অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাঁর সময়ের ছাত্রলীগ নেতৃত্ব তাঁকে ছাত্রলীগের কমিটিতে একটি সদস্যপদ দেননি। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সে সময়ে আওয়ামী লীগের অঘোষিত একক নেতা। এ কারণে বা এই শক্তিতে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কমিটিতে সদস্যপদ চাননি। তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় স্কুলজীবন থেকে। আর যখন তিনি সদস্যপদ চেয়েছিলেন তার আগেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মহিলা কলেজটির সংসদের ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তাঁর ছাত্র রাজনীতির যোগ্যতা প্রমাণ করে এসেছেন। ওই সময়ে যারা ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন তাঁরা সবাই ছাত্রজীবনের কোনও না কোনও সময়ে একটি কলেজ সংসদের ভিপি ছিলেন এমনটি বলা যাবে না। অথচ তাঁরা কমিটিতে পদ পেলেও শেখ হাসিনা পাননি। তাই ছাত্র রাজনীতিতে তাঁকে এগোতে হয়েছিল পদ-পদবী ছাড়াই। ছাত্ররাজনীতি শেষে রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ টেনে না নিলেও সক্রিয় রাজনীতি থেকে তাঁকে দূরে থাকতে হয়েছিল কিছুদিন স্বামীর উচ্চশিক্ষার কারণে। এই সময়েই তাঁর এবং জাতির জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় আসে। সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ হাসিনা প্রবাসে বসে এই সংবাদ পান। পরিবারের সকলের এই নির্মম মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরেও শেখ হাসিনা শতভাগ ভেঙে পড়েননি। আজ ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সে সময়েও তিনি দেশ ও জাতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই সময়ে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রবাসেই ছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে একটি বিবৃতি দেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে সরকার গঠিত হয়েছে তা অবৈধ। কিন্তু শেখ হাসিনার এই অনুরোধ ড. কামাল হোসেন রাখেননি। সেদিন যদি এই বিবৃতি দেওয়া হতো এবং শেখ হাসিনা যদি ড. কামাল হোসেনকে এই সংগ্রামে তাঁর পাশে পেতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দ্বারা গঠিত সরকার আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট প্রশ্নের মুখে পড়তে পারতো। কারণ, ওই সময়ে পৃথিবীর অনেক বড় নেতাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা চাচ্ছিলেন বাংলাদেশের সরকারের ভেতর থেকে এবং সরকারি দলের ভেতর থেকে এর একটা প্রতিবাদ হোক। যাদের ভেতর অন্যতম ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আব্দুর রহমান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ, এমন অনেকেই। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে এবং সেই খুনিদের দ্বারা গঠিত সরকার আর সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠলে ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতা ও জনগণ অবশ্যই সেই প্রতিবাদকে সমর্থন করতো, সমর্থন মিলতো আমেরিকার গণতন্ত্রকামী জনগণেরও।


কিন্তু সেদিন ড. কামাল হোসেনকে পাশে না পাওয়ার ফলে শেখ হাসিনা এই সংগ্রামের পথে যেতে পারেননি। তাঁকে মেনে নিতে হয়েছিল ভারতে প্রবাস জীবন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত এই প্রবাস জীবনে শেখ হাসিনা কখনও রাজনীতি থেকে দূরে থাকেননি। বরং তিনি তখনই যুক্ত হতে চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর ডায়েরি থেকে জানা যায়, তিনি দিল্লিতে নির্বাসিত শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গেলে শেখ হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন, আপনি রাজ্জাক ভাইকে বলুন তিনি যেন আমাকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন মেম্বার করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী হিসেবে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও তখন ভারতে নির্বাসিত। তারপরেও তিনি পত্রবাহক মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাকের কাছে শেখ হাসিনার এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক সেটা করেননি। আব্দুর রাজ্জাক যদি এটা করতেন তাহলে আরও দুই থেকে তিন বছর আগেই শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দেশে ফিরতে পারতেন। আজ ইতিহাস পর্যালোচনা করে বলা যায়, তিনি আরও আগে দেশে ফিরলে ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো। গণআন্দোলনের ভেতর দিয়ে যেমন এরশাদের পতন ঘটেছিল, এই পতনটি জিয়াউর রহমানেরই ঘটতো। কারণ, ১৯৭৮-৭৯ সালে জিয়াউর রহমান প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল বা জোটের ভিত্তি শক্তিশালী করে উঠতে পারেননি। বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার আগে যদি সামরিক সরকারকে গণআন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করা সম্ভব হতো তাহলে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীলরা আজ এভাবে শক্তিশালী হতে পারতো না। এমনকি প্রতিক্রিয়াশীলদের মূল আশ্রয়দাতা বিএনপি নামক দলটিও শক্তিশালী হতে পারতো না। আব্দুর রাজ্জাক নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা এবং শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্য থেকেই সেদিন শেখ হাসিনার এই অনুরোধ রাখেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ যে ভিন্ন হতে পারতো সেটাও হতে দেননি।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন একটি ধারণা আছে যে আব্দুর রাজ্জাক ও ড. কামাল হোসেন এরা মিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন। কথাটি আদৌও সত্য নয়। সেদিন আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতারা চাননি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হোক। বরং শেখ হাসিনার ইচ্ছা তাঁর নেতাকর্মীদের কাছে প্রকাশ পাওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়। অন্যদিকে দলের ভাঙনের বদলে শেখ হাসিনার ইচ্ছাকেই সেদিন বড় বড় নেতাদের মেনে নিতে হয়েছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছিল। কারণ, তৎকালীন দুই পরাশক্তিতে বিভক্ত পৃথিবীর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি যথাক্রমে মার্কিন, সৌদি ও পাকিস্তানি চক্র বাংলাদেশের মাটিতে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে শক্তিশালী ঘাঁটি গেড়ে বসতে যাচ্ছিল। বিষয়টি শুধু প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য নয়, ভারত মহাসাগরীয় এলাকার সামরিক ভারসাম্যতেও বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল। কারণ, জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করতে পারলে সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম মার্কিনিদের হাতে তুলে দিতেন। তাই তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রয়োজনে, এ অঞ্চলের সামরিক শক্তির ভারসাম্যের প্রয়োজনে- জিয়াউর রহমান যাতে তার ক্ষমতা দৃঢ় করতে না পারে তা ঠেকানোর একান্ত প্রয়োজন ছিল। জিয়াউর রহমানের এই ক্ষমতা দৃঢ় করাকে ঠেকানোর শক্তি ড. কামাল হোসেন, মালেক উকিল বা আব্দুর রাজ্জাকের ছিল না। বরং ড. কামাল হোসেন এক্ষেত্রে মার্কিনিদেরই সহায়তাই করতেন। আর চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গাড়তে পারলে ওই সময়ে বিশ্ব রাজনীতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের অনেক অনুকূলে চলে যেতো। ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় সামরিক ক্ষমতার লড়াইয়ে তৎকালীন সোভিয়েত-ভারত জোট পিছিয়ে পড়তো। এ কারণেই সেদিন দুই ভাগে বিভক্ত পৃথিবীর প্রগতিশীল অংশ চেয়েছিল আওয়ামী লীগের শক্তিশালী নেতৃত্ব। আর ততদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে শেখ হাসিনা ফিরে এসে নেতৃত্ব নেওয়া ছাড়া আওয়ামী লীগে কোনও শক্তিশালী নেতা নেই।


১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন প্রকাশ্যে এবং রাজনীতির অন্দরমহলে কয়েকটি ঘটনা ঘটে। যে ঘটনাগুলো প্রমাণ করে এক শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন শুরু হয়। প্রকাশ্যে যা ঘটেছিল তা ছিল জনসমাগম। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেদিন ঢাকার রাজপথে যে মানুষ নেমে এসেছিল তা একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এর আগে কখনোই ঢাকায় এত জনসমাগম হয়নি। ওই বিশাল জনসভায় জনগণ শুধু একটি সুরই তুলেছিল, শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা। এর ভেতর দিয়ে চিহ্নিত হয়ে যায় আওয়ামী লীগের কর্মী, সমর্থক এবং স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের নেতা আজ থেকে শেখ হাসিনা। আর ওইদিন অন্দরমহলে যা ঘটেছিল তা ছিল এমনই- তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তার সমস্ত প্রোগ্রাম বাতিল করে ক্যান্টনমেন্টে সারা দিন-রাত কাটিয়েছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল শেখ হাসিনা এই বিপুল জনতাকে যেকোনও জ্বালাও পোড়াওয়ের সংগ্রামের দিকে আজই ঠেলে দিতে পারেন। এই ভয়ে তিনি তাঁর পূর্বঘোষিত সব প্রোগ্রাম বাতিল করে ক্যান্টনমেন্টে লুকিয়ে ছিলেন। অন্য যে ঘটনাটা অন্দরমহলে ঘটেছিল তা হলো- আওয়ামী লীগের কিছু উচ্চাভিলাষী নেতার চরম হতাশা প্রকাশ। তাঁরা ওই জনসভা শেষে নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে বা ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন এমন নেতাদের কাছে সেদিন তাদের হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। এরা সকলেই রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন জনতা তাঁদের নেতাকে বরণ করে নিয়েছে। নেতা এবং জনতার মাঝখানে আর কোনও অবস্থান নেই।


অন্যদিকে, ভীরুতা এবং অপরাধবোধ থেকে ক্যান্টনমেন্টে লুকিয়ে জিয়াউর রহমান যে আশঙ্কা করেছিলেন- শেখ হাসিনা জনতাকে সহিংস পথে ঠেলে দেবেন, শেখ হাসিনা তা করেননি। সর্বোচ্চ অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মতো তেত্রিশ বছর বয়স্ক শেখ হাসিনা সেদিন তাঁর মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ‘শোককে শক্তিতে পরিণত করুন’। পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগে মোটা দাগে দু’টি ধারা ছিল। তরুণ এবং আওয়ামী লীগের বড় অংশটি স্থির ছিলেন যেকোনও মূল্যেই হোক বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। অন্য অংশটি ব্যস্ত ছিল সামরিক সরকারের সঙ্গে এবং তৎকালীন পাক-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালদের সঙ্গে সমঝোতা করে রাজনীতির ভেতর দিয়ে কিছুটা নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা। শেষোক্ত এই অংশটি শেখ হাসিনা ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারে তাঁদের এই অপরাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি যারা বুকের ভেতর ধারণ করতেন তাঁরাও বুঝতে পারলেন একটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভেতর দিয়েই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে হবে। এখানে প্রতিশোধ নয়, আইনের শাসনের পুনঃস্থাপন। ‘শোককে শক্তিতে পরিণত করুন’ শেখ হাসিনার এই একটি কথার ভেতর দিয়েই তাঁরা ভবিষ্যতের রাজনীতি বুঝতে পারেন। অর্থাৎ প্রথম দিনেই এককভাবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ যেমন হাতে উঠিয়ে নিলেন, তেমনি তার গুনগত পরিবর্তনও করলেন।


শেখ হাসিনার এই রাজনীতির গুনগত পরিবর্তন করা তৎকালীন সরকার ও তাঁর দলের লোক মিলে তিনটি শ্রেণি মেনে নিতে পারেনি। এক. দলের ভেতর থাকা হঠকারী গ্রুপ, দুই. স্বার্থবাদী গ্রুপ, তিন. যে অপশক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিল তারা। এরা ধীরে ধীরে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শেখ হাসিনার নানা বিরোধিতা শুরু করেন। দলের ভেতর এর প্রকাশ ঘটে ১৯৮৩ সালে। ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে সমঝোতা করে ছাত্রলীগের ঐক্য ও দলীয় ঐক্য সেদিন ধরে রাখা সম্ভব ছিল। শেখ হাসিনা সে চেষ্টা করেছিলেনও। ব্যক্তি উদ্যোগে তিনি বহু নেতার বাসায় গিয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগে তাঁর অবস্থান হারিয়ে ফেলাটাকে সহজভাবে নিতে পারছিলেন না। শেখ হাসিনার অবর্তমানে তিনি যে অনেকখানি একক নেতার ক্ষমতা ভোগ করেছিলেন হঠাৎ করে সেই ক্ষমতা হারানোকে কোনোমতেই তিনি মানতে পারছিলেন না। আর এরই সুযোগ নেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারি গ্রুপ, যারা সামরিক শাসক এরশাদের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁরা তাঁদের রাষ্ট্র মেকানিজম ব্যবহার করে সেদিন আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশাল নামে আরেকটি ‘জাসদ’ করতে সমর্থ হয়। সেদিন এই বাকশাল করার ভেতর দিয়ে পঁচাত্তর পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর রক্তের সপক্ষে যে তরুণ শ্রেণি গড়ে উঠেছিল তার একটি বড় অংশকে আব্দুর রাজ্জাক বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যান। এক্ষেত্রে আমি আগেও লিখেছি আবারও বলি, ষাটের দশকে বাংলাদেশের যে মানব শিশুরা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারে দেব শিশুতে পরিণত হয়েছিল, স্বাধীনতার পরপরই সিরাজুল আলম খান জাসদ সৃষ্টি করে তাঁদের একটি বড় অংশকে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দেন। আবার বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপরে যে পঁচাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল তার একটি বড় অংশকেই হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো আব্দুর রাজ্জাক বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। আর এর পরিণামও আমরা দেখেছি ষাটের দশকের ওই দেবশিশুরা জাসদের লক্ষ্যহীন রাজনীতিতে ক্লান্ত হয়ে এক সময়ে নানান দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর পরবর্তীতে ক্ষুদ্রাকৃতির জাসদে যারা আসে তাঁরা সকলেই মোটামুটি সুবিধাবাদী চরিত্রের। আব্দুর রাজ্জাকের বাকশালও ক্ষুদ্রাকৃতি ধারণ করার পরে যারা বাকশাল করেছেন তাঁরা আজ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল স্থানে থাকলেও তাদের চরিত্র সুবিধাবাদী। এবং এরা যখন বাকশালে ছিল তখন যে ভাষায় শেখ হাসিনাকে গালি দিতেন, জামায়াতে ইসলামীও কখনও শেখ হাসিনা সম্পর্কে ওই ভাষায় কথা বলতে সাহস পায় না। আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকে খুব দ্রুতই যুব নেতৃত্বের একটি দল শেখ হাসিনার কাছে ফিরে আসে। তারপরও ততদিনে এই বিভক্ত দলকে আবার গোছাতে শেখ হাসিনাকে অনেক ক্ষেত্রে একাই পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেদিন আমীর হোসেন আমু, সাজেদা চৌধুরী এমনি হাতেগোনা কয়েকজন সিনিয়র নেতাই মাত্র শেখ হাসিনাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছিলেন। বাদবাকিটা তাঁকে তাঁর কর্মীদের সহায়তায় করতে হয়। এর মাত্র দু’বছর পরেই আসে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে যাওয়া ভুল ছিল কী সঠিক ছিল সে বিষয়টি লিখতে গেলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত লেখা প্রয়োজন এবং এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। তবে সেসব এখানে নয়। কিন্তু ১৯৮৬’র এই পার্লামেন্ট থেকে ৮৮ সালে পদত্যাগ করে শুধু রাজপথে এসে বিএনপি’র পুনরায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা শেখ হাসিনার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। এই ইচ্ছে না থাকাটাই ছিল সঠিক রাজনীতি। কিন্তু শেখ হাসিনা সেদিন দলের একশ্রেণির নেতাদের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। দলের ভেতর এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির হোতা ছিলেন সেদিন ড. কামাল হোসেন ও ব্রিগেডিয়ার খলিলুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আরও অনেকেই ছিলেন। ভবিষ্যতের গবেষকরা এগুলো অতি সহজেই গবেষণা করে পাবেন এবং আমাদের মতো সাংবাদিকরাও হয়তো সময় সুযোগ মতো লিখতে পারবো।


তবে রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে বলা যায় সেদিন শেখ হাসিনা যদি তাঁর ইচ্ছেমতো ৮৬’র পার্লামেন্টের মেয়াদ পূর্ণ করতে সমর্থ হতেন তাহলে ৯১-এর বিএনপি হয় না। কারণ, ৮৬-এর পার্লামেন্ট পূর্ণ হতে যে সময় লাগতো তাতে বিএনপিতে কেউ থাকতো না। সবাই জাতীয় পার্টিতে চলে যেত। এছাড়া পার্লামেন্ট ও পার্লামেন্টের বাইরে আন্দোলন করে শেখ হাসিনা ততদিনে এরশাদের অবস্থানকে সেভাবে দুর্বল করতে পারতেন এবং রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য অর্জন করতেন। তার ফল এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য অনেক ভালো হতো। এবং ৮৬’র পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করে আসার ফলে বিএনপিসহ এ দেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা দেশের মানুষের ভেতর ধোয়াশা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয় যে শেখ হাসিনা আপসকামী নেত্রী এবং বিএনপি নেত্রী আপসহীন। মানুষের এই ভুল ধারণাকে ভেঙে দিতে শেখ হাসিনাকে একাই লড়তে হয়েছে দীর্ঘদিন।


২০০৭ সালের ১/১১-এ সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে যখন দেশকে বিরাজনীতিকরণের চেষ্টা করে ওই সময় একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া সকল রাজনৈতিক নেতাই তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তখন দেশের মানুষ চাক্ষুষ প্রমাণ পায় বাংলাদেশে একমাত্র সাহসী ও আপসহীন রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনা। ১৯৮৮ সালে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের প্রচারে শেখ হাসিনাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যে আপসকামী নেতার তকমা এঁটে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং বেগম জিয়ার শরীরে পরানোর চেষ্টা হয়েছিল আপসহীন নেত্রীর পোশাক- তার অবসান ঘটে ওই সময়ে।


৮৮-এ পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে রাজপথে আসার পরেও সেদিন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ (যদিও তখনও এটা ১৫ দলীয় জোট হিসেবে বলা হতো) দলই ছিল রাজপথে আন্দোলনের মূল শক্তি। ৮৮-এর মাঝামাঝি থেকে ৯০-এর ডিসেম্বর এই আড়াই বছরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদের পতন হয়, এমনটি অনেকে ধারণা করেন। বিভিন্নভাবে ইতিহাসে সেটাই লেখার চেষ্টা হয়েছে। এর একমাত্র কারণ জিয়াউর রহমান যে সামরিক শাসক ছিলেন আর এরশাদ তার ধারাবাহিকতা এটা লুকানোর জন্য। তাছাড়া পরবর্তীতে সামরিক শাসকবিরোধী রাজনৈতিক শুদ্ধাচার বাংলাদেশ মানতে পারেনি। দীর্ঘ সামরিক শাসনের কুফল মৌলবাদকে ঠেকানোর জন্য সামরিক শাসকের উত্তরাধিকারের একাংশ এরশাদের পার্টির সঙ্গে সংসদীয় আসনভিত্তিক আপস করে আওয়ামী লীগ। এই আপসের ফলে দেশের রাজনীতির কী ক্ষতি বৃদ্ধি হয়েছে সেটা আরেক প্রসঙ্গ। তবে সামরিক শাসকের উত্তরাধিকার ও প্রকৃত রাজনৈতিক দল এগুলোর রাজনীতি এভাবে গুলিয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সময়কাল এবং তার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম সেটা সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি। তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার, ৯০-এ এরশাদের পতন হয়নি, পতন হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে থেকে যে সামরিক শাসনের ধারা বাংলাদেশে শুরু হয়; জিয়াউর রহমান ও এরশাদের মাধ্যমে যেটা দেড় দশক চলে সেই সামরিক শাসনের ধারার।


কিন্তু সামরিক শাসনের ধারায় যখন পতন ঘটে ওই সময়ে সামরিক শাসক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি অনেক বেশি শেকড় গেড়ে ফেলেছে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এই সত্য সামরিক শাসন উৎখাত পরবর্তী ১৯৯১-এর নির্বাচনের আগে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। তাছাড়া ততদিনে পৃথিবীর রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একটা পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল। যার মূল কারণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতা। অন্যদিকে, তথ্যপ্রযুক্তির নয়া উন্মেষ। এই দুই বিষয় গোটা পৃথিবীর নব্বইয়ের দশকের তরুণদের মন বদলানো শুরু করে দিয়েছিল। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে মূল্যবোধ, বিশেষ করে সাম্যবাদ প্রভাবান্বিত যে বোধটি পৃথিবীর নানান দেশের মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের মনে বিকশিত হয়েছিল- সেটা ওইভাবে আর শক্তিশালী থাকে না। তার পরিবর্তে মধ্যবিত্ত মানসিকতায় অনেক বেশি আত্ম-উন্নয়নের তাগিদ চলে আসে। এই আত্ম উন্নয়নের তাগিদের আশ্রয় হিসেবে তারা স্থান খুঁজে পেতে শুরু করে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণিতে ততদিনে এই বাতাস অনেকখানি লেগেছে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনের আগে সেটা বুঝতে ব্যর্থ হয়। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সকল মানুষকে এক করে নিয়ে তারা নির্বাচনে যেতে পারেনি। এখানে একটা বড় ক্ষতি করেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ও তাঁর বাকশালের সভাপতি মহীউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে নির্বাচন করলেও আব্দুর রাজ্জাক অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসনে তাঁর বাকশাল প্রার্থী কাস্তে মার্কায় দাঁড় করিয়ে রাখে। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনে বিজয়ের পথে আরও একটি বাধা হয়। তবে ইতিহাসের সার্বিক বিশ্লেষণ করে এখন এ কথা স্পষ্ট বলা যায়, ৯১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনসহ ওই সময়ের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন অনেক কারসাজি করেছিল। তার অনেক উদাহরণও আছে। নির্বাচনে প্রশাসনের অন্দরমহলকে আওয়ামী লীগ ঠেকানোর কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাতে পরিপূর্ণ সমর্থন ছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের। এছাড়াও ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনা বিশ্লেষণ করে এটাও বলা যায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠী ও তাদের সঙ্গে যোগ দেন বাকশাল নেতা আব্দুর রাজ্জাক। তারাও বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের ওই কাজকে সমর্থন করেন। অর্থাৎ প্রশাসনের অন্দরমহল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া থেকে ঠেকানোর কাজে তারা তাদের অবস্থান থেকে সমর্থন জোগান। ড. কামাল হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক গোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য ছিল ৯১-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে পরাজিত করলে তার নেতৃত্ব দলের ভেতর প্রতিরোধের মুখে পড়বে। তাদের ধারণা ছিল ৯১-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনা পরাজিত হলে তারা আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব থেকে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে পারবেন। সেদিন এই সকল ষড়যন্ত্রই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কাজ করে। নির্বাচনের ফল ঘোষণাকালে এমনকি নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই বিষয়টি শেখ হাসিনার কাছে স্পষ্ট হয়ে আসে। তাই ফল ঘোষণার পরপরই তিনি প্রায় বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে তাকে হারানো হয়েছে। সেদিন তার এই কথা নিয়ে অনেকেই হাসি ঠাট্টা করেছিলেন। অনেকেই সংযত ভাষায় বলেছিলেন- শেখ হাসিনা এ কথা না বললে ভালো করতেন। কিন্তু প্রশাসন কাজে লাগিয়ে যে কারচুপি করা যায় তা স্পষ্ট হয়ে যায় ২০০১-এর নির্বাচনে এবং ওই নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ আর আরেক বিচারপতি লতিফুর রহমান সরকারের অধীনে। এবং ওই নির্বাচনে সাহাবুদ্দিন, লতিফুর রহমানকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছিলেন ড. কামাল হোসেন। আর এর ভেতর দিয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও কামাল হোসেনের চরিত্র উন্মোচিত হয়। তখন এ সত্যও প্রমাণিত হয় ১৯৯১ সালে শেখ হাসিনা একা যে কথাটি বলেছিলেন, অর্থাৎ সূক্ষ্ম কারচুপির কথা, সেটা যে এই প্রশাসনিক কারচুপি তা অধিকাংশ মানুষের বুঝতে বাকি থাকে না। এখানেও শেখ হাসিনাকে দশ বছর অপেক্ষা করতে হয় সত্যকে উন্মোচিত করার জন্য।


যাহোক, ১৯৯১-এর নির্বাচনের পরবর্তী কথায় ফিরে আসা যাক। ১৯৯১-এর নির্বাচনের পরপরই ড. কামাল হোসেন তার অনুসারী আমেরিকান লবির ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী এন্তাজউদ্দিন আহমেদের (এ ইউ আহমেদ) মাধ্যমে রাতারাতি ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজ বের করান। সেখানে ড. কামাল হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার ও কাদের সিদ্দিকীর একটি খোলা চিঠি ছাপা হয়। কাদের সিদ্দিকী শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে সবসময় একটা হীনম্মন্যতায় ভোগেন। যে কারণে তিনি সবসময় ড. কামাল হোসেনকে অধিক শিক্ষিত ব্যক্তি মনে করে তাঁর দ্বারা ব্যবহৃত হন। কাদের সিদ্দিকীর ওই চিঠি ছিল কামাল হোসেনের প্রভাবে লেখা। কামাল হোসেন ও কাদের সিদ্দিকীর মূল সুর ছিল আওয়ামী লীগে যৌথ নেতৃত্ব। কামাল হোসেনের এই যৌথ নেতৃত্বের দাবি তোলার পরপরই বেশ কয়েকজন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা এ দাবিকে গোপনে সমর্থন জানান। এটা ছিল মূলত শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কৌশল। এ কাজে তখন যে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই কিছু অর্থ ব্যয় করেছিল তারও প্রমাণ ওই সময়ের কিছু রাজনৈতিক ঘটনা প্রমাণ করে। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা ফেরার পর থেকেই আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাকেই নেতা মেনে নিয়েছেন। তাই কামাল হোসেনের এই চক্রান্তে সাধারণ কর্মীরা ফুঁসে ওঠে। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সাধারণ কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন কামাল হোসেনসহ বেশ কয়েক নেতা। আর এই কর্মীদের কারণেই ব্যর্থ হয়ে যায় কামাল হোসেনদের এই চক্রান্ত।


১৯৯১-এর নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার রাজনীতির আরেক নতুন যাত্রা শুরু হয়। পৃথিবীর সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই এমনই একটার পর একটা সাগর পাড়ি দিতে হয়। ৯১-এর পরে শেখ হাসিনার নৌকা ঠিক তেমনি এক সাগরে পড়ে। তখন দুটো বিষয় খুব বড় হয়ে সামনে আসে। বাংলাদেশের সামাজিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে জাগিয়ে রাখতে হবে এবং আওয়ামী লীগকে যে কোনও মূল্যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসতে হবে। কারণ ১৯৯১-এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জামায়াত ও বিএনপির ক্ষমতায় আসা মূলত ছিল ৭৫-এর ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় আরেকটি বড় ধরনের প্রতিবিপ্লব। ৭৫-এ প্রতিবিপ্লবীরা অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। আর ৯১-এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে প্রতিবিপ্লবীরা একটি নিয়মতান্ত্রিক বৈধতা পায় বাংলাদেশে। ৯১-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সাহাবুদ্দিন ও ড. কামাল হোসেনরা যে ক্ষতি বাংলাদেশের করেছেন তার ফল যে এদেশকে কতদিন ভোগ করতে হবে তা এখনও স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। যাহোক, ৯১-এর নির্বাচনের পরে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাধীনতার মূল্যবোধ জাগাতে ও সাধারণের মাঝে সেটা বাঁচিয়ে রাখতে শেখ হাসিনাকে বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে হয়। যার ভেতর অন্যতম ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। নির্বাচনের কিছুদিন পরেই তিনি অরাজনৈতিকভাবে এই আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন এবং এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য নিজেই অনুরোধ নিয়ে যান বেগম সুফিয়া কামালের কাছে। তিনি তাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন। বেগম সুফিয়া কামাল সব শুনে বলেন, বিষয়টির সঙ্গে তিনি সহস্রভাগ একমত। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তাঁর নেই (বাস্তবেও তাঁর শরীর তখন অনেক ভেঙে পড়েছিল)। এ কারণেই তিনি পরামর্শ দেন শহীদ রুমীর মা, জাহানারা ইমামকে প্রধান করে এই অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার এবং শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বেগম সুফিয়া কামাল তখনই জাহানারা ইমামকে ফোন করে বিষয়টি জানান। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বেবী মওদুদসহ কয়েকজন জাহানারা ইমামের বাসায় যান। আর এভাবেই সেদিন শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এই আন্দোলন শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে না। পাশাপাশি জামায়াত ও বিএনপির মৌলবাদী আগ্রাসনকেও রুখে দেয় অনেকখানি। এভাবেই যেমন সমাজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখেন শেখ হাসিনা- পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ভেতর নানানভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের তিনি এটা বুঝাতে সক্ষম হন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা না বাঁচাতে পারলে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশে বিশ্বাসীদের অস্তিত্ব জামায়াত-বিএনপির হাতে নিরাপদ নয়। যার ফল পাওয়া যায় ১৯৯৬-এর জনতার মঞ্চের আন্দোলনে। সেদিন মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল কর্মকর্তারা জনতার মঞ্চের আন্দোলনে এসে শামিল হন। যার ফলে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এর অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপির পতন হয়। সৌভাগ্যক্রমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের নেতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিচারপতি হাবিবুর রহমান। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিবিপ্লবীরা তাঁর সরকারের ওপরও ছোবল দেওয়ার চেষ্টা করে। তাঁরা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে যায়। কিন্তু বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সাহসিকতা সেই চক্রান্ত নষ্ট করতে সমর্থ হয়। যার ফলে ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে একটি মোটামুটি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হয়। আর ওই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ২১ বছর পর শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ১৯৮১ সাল থেকে ৯৬ অবধি এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন শেখ হাসিনা।


সফলতার মুখ দেখলেও ২১ বছর পর স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় নিয়ে এলেও তাঁর চলার পথটি মোটেই সহজ ছিল না। কারণ, ২১ বছরের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের ফলে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা এমনকি মানুষের মানবিক ভূগোলও ততদিনে বদলে গেছে। ষাট- সত্তর এমনকি আশির দশকেরও উদার চেতনার পেছন দিক থেকে একটা ভাটার টান ততদিনে শুরু হয়ে গেছে। তারপরেও ১৯৯৬ থেকে ২০০০ এই পাঁচ বছরের ক্ষমতাকালে শেখ হাসিনা অনেক মৌলিক পরিবর্তন বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে আনেন। যেমন- তাঁর এই আমলেই বাংলাদেশ প্রথম মূল খাদ্য চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের জিডিপি যে ৫ থেকে ৫.২-এর বৃত্তে আটকা ছিল, সেটাকে ভেঙে ৬ এর উপরে নিয়ে যেতে সমর্থ হন। অন্য দুটি মৌলিক বিষয় ছিল, শিক্ষা-ব্যবস্থার সেশনজটমুক্ত করা এবং বাঙালির সংস্কৃতির অঙ্গনকে উজ্জীবিত করা। জিডিপির বৃত্ত ভাঙা এবং মূল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার একটা বড় কারণ ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন। ক্ষমতা লাভের পরে যে বিদ্যুৎ শেখ হাসিনা পেয়েছিলেন সেটাকে তিনি চারগুণ বেশি উৎপাদনে নিয়ে যান। এছাড়া ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি তাঁর ওই আমলেই নেওয়া হয়। গড়ে তোলা হয় ব্যাপক সড়ক, নৌ এবং রেলযোগাযোগ অবকাঠামো। এর বাইরে যে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে সেটা ছিল পাঁচ বছরে কোনও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়েনি।


১৯৯৬ থেকে ২০০১-এর জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত এই সরকারের যাবতীয় উন্নয়ন থেকে শেখ হাসিনাসহ দেশের মানুষের স্থির বিশ্বাস ছিল পরবর্তী নির্বাচনে এই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার কারণে শেখ হাসিনা তাঁর দলকে নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু সেটা কেন ঘটেনি অর্থাৎ ২০০১-এর নির্বাচন কীভাবে হয়েছিল সে কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ২০০১-এর ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়তায় ক্ষমতায় আসার পরে জামায়াত ও বিএনপি ধরে নেয় শেখ হাসিনা জীবিত থাকলে আজ হোক কাল হোক তিনিই ক্ষমতায় আসবেন। কারণ তত্ত্বাবধায়ক জামায়াত ও বিএনপি সরকারের সহায়তা পাওয়ার পরেও ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪৪%-এর উপরে ভোট পায়। তাছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনা যে অন্য সকলের থেকে বেশি দক্ষ সেটা তার পাঁচ বছরের ক্ষমতাকাল প্রকাশ করে দিয়েছে। এ কারণে তখন জামায়াত-বিএনপি সিদ্ধান্ত নেয় ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের যেভাবে একে একে হত্যা করা হয়েছিল শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই একই পথ তারা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে ওই আমলের যে সব গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা করা হয় তা মোটামুটি সকলেই জানেন। সর্বোপরি, পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর সহায়তায় ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট শেখ হাসিনাকে যে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল সে ২১শে আগস্টের ঘটনাও সকলেই জানেন। এর বাইরেও তারেক রহমান ও তার সহযোগীরা তামিল টাইগারদের (এলটিটি) সঙ্গে যোগাযোগ করে শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদনে হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়। এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য তামিল টাইগারদের যে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার একটা অংশ পেমেন্টও করা হয়ে গিয়েছিল। তামিল টাইগারের দুইজন সদস্য সুধা সদন রেকি করেও গিয়েছিল। শেখ হাসিনা এবারও ভাগ্য জোরে বেঁচে যান। আবারও প্রমাণিত হয় তিনি ‘ডটার অব ডেসটিনি’। কারণ এই দুইজন তামিল টাইগার সদস্য সুধা সদন রেকি করে পেমেন্টের একটা অংশ নিয়ে স্থলপথে ভারত হয়ে শ্রীলংকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। তারা দু’জনই ভারতে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। এই মৃত্যুই মূলত ওই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়। এরপরেও জামায়াত-বিএনপি তাকে হত্যার পরিকল্পনা থেকে সরেনি। এভাবে একটি বুলেট বা গ্রেনেডের মুখে নিজেকে রেখেও ২০০৬ পার করেন শেখ হাসিনা। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের শাসনকাল শেষ হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ বছরের শেষ সপ্তাহ ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের সময়। সমগ্র ঢাকার রাজপথে সেদিন কাঠ ও বাঁশের লাঠি হাতে নেমে এসেছিল লাখো মানুষ। বিএনপির প্রায় সব নেতারা লুকিয়েই ছিল সেদিন। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ডাকে ১৯৯০, ১৯৯৬ এবং ২০০৬ এই তিনবার তিনটি গণঅভ্যুত্থান ঘটে। একজন রাজনীতিকের জীবনে এই মাপের রাজনৈতিক আন্দোলনের সফলতা ইতিহাসে দেখা যায় না। ২০০৬-এর ওই গণঅভ্যুত্থানের কারণে বিচারপতি কে.এম. হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ গ্রহণ না করার ঘোষণা দেন। তখন বিএনপি চেয়েছিল পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে, যাতে সামরিক শাসন অনিবার্য হয়। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিল যেকোনও ধরনের নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার বিপুল বিজয় হবে। আর এই সামরিক সরকার আনার পরিকল্পনা থেকেই তারা তাদের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করে। তারা মনে করেছিল শেখ হাসিনা কোনোমতেই ইয়াজউদ্দীন সরকারকে মানবেন না। বরং তিনি রাজপথের আন্দোলনকে আরও বাড়িয়ে দেবেন। আর এটাকেই অজুহাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে সমর্থ হবে। কিন্তু এখানে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে বিএনপি হেরে যায়। শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াজউদ্দীন সরকারকে সমর্থন করেন। আর তাঁর এই এক সিদ্ধান্তেই বিএনপির চক্রান্ত নব্বই ভাগ শেষ হয়ে যায়। এখানে অবশ্য রাজনীতির অন্দরমহলের আরও কিছু ঘটনা ছিল। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামিক জঙ্গিবাদী হামলায় তখন জর্জরিত। অন্যদিকে, লাদেনের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জাওয়াহেরি জামায়াত-বিএনপি সরকারের আনুকূল্যে তখন সশরীরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, উখিয়া এবং মিয়ানমারের আরাকানে দীর্ঘদিন ধরে তার কর্মকাণ্ড চালায়- যা ওই সময়ে টাইম ম্যাগাজিন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছিল। এ সবকিছু জানার ফলে পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াত-বিএনপি ও তারেক রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসুক এটা কোনোক্রমেই চাইছিল না। অন্যদিকে কে.এম. হাসান যদি শেখ হাসিনার আন্দোলনের মুখে দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে বিএনপি তাদের প্ল্যান বি হিসেবে ইয়াজউদ্দীনের সরকারের ফর্মুলা তৈরি করে রেখেছিল, যা পশ্চিমা বিশ্ব জানতো। তাই পশ্চিমা বিশ্বের কূটনীতিকরা বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেই ইয়াজউদ্দীনের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন, যদি ইয়াজউদ্দীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন তাহলে তিনি কোনও কারচুপির নির্বাচনের পথে হাঁটবেন না। আর গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সমর্থন পেলে তিনি বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের জন্য যদি অন্য কোন ধরনের সরকারও হয় সেটা মেনে নেবেন। ইয়াজউদ্দীন তার প্রতিশ্রুতি শতভাগ রাখেননি ঠিকই, তবে এটাও ঠিক পশ্চিমা বিশ্ব ওই সময়ে বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের কথামতো কাজ করতে গিয়ে ভুল করে বসে। তারা বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যাতে ক্ষমতায় আসতে পারে সে কাজে সহায়তা করে। কারণ, সুশীল সমাজ তাঁদের বোঝাতে সমর্থ হয়েছিল জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় এলে মৌলবাদীরা আসবে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা এলে জামায়াত-বিএনপি দেশকে অস্থিতিশীল করবে। যাহোক, শেষ পর্যন্ত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে সরকার গঠিত হলেও তারা শেখ হাসিনার আপসহীন একক নেতৃত্বের কাছেই পরাজিত হয় এবং তাদের নির্বাচন দিতে হয়- সে কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বিরাজনীতিকরণের জন্য যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে তাদের নিরাপদে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেন শেখ হাসিনা। এই সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবেই নেন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে এমন পরিপক্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এ ধরনের সরকারের পরিবর্তন এর আগে কখনোই ঘটেনি। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে এটা একটা মাইলস্টোন।


এরপর থেকে গত প্রায় ১২ বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন। শেখ হাসিনার ১২ বছরের ক্ষমতাকালের সুফল দেশের মানুষ ভোগ করছেন। এই ১২ বছর নিয়ে লিখলে এটা আর কোনও নিবন্ধ থাকবে না, একটি পরিপূর্ণ বই হয়ে যাবে। তাই এই ১২ বছরের ঘটনা ও পর্যালোচনা একত্রে লেখার বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্যই থাকুক। তবে তার এই ১২ বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ নানান বিষয় নিয়ে কয়েক শত লেখা লিখেছি। যাক সে কথা, এই লেখা যখন লিখছি শুধু এ সময়ের ঘটনাটি উল্লেখ করেই লেখাটি শেষ করতে চাই। এই লেখা যখন লিখছি বাংলাদেশে এ সময়ে করোনা সংক্রমণের প্রায় দুই মাস পূর্ণ হতে চলেছে। শেখ হাসিনাকে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দুর্গম রাজনীতির পথ পাড়ির জীবনের এই প্রান্তে এসে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্যোগটি মোকাবিলা করতে হবে, এটা মাত্র তিন থেকে চার মাস আগেও কেউ জানতো না। যাহোক, এ দুর্ভাগ্য গোটা পৃথিবীর। তবে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯-এর এই মহাবিপর্যয়কালেও দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে প্রায় একা ও এককভাবে লড়তে হচ্ছে। তিনি শুরুতেই সময় মতো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি নেননি এটা নিয়ে অনেকের অনেক মত রয়েছে। তবে বিশ্বের সব দেশকেই মনে হচ্ছে তারা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে ফেলেছে। আবার মনে হচ্ছে, এভাবে আক্রান্ত হবে এটা ধারণায় ছিল না। যাহোক, শেখ হাসিনা যখন থেকে এই বিপদটি উপলব্ধি করেছেন তারপর থেকেই তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিচক্ষণতা এবং আন্তরিকতাকে দোষ দেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব আছে। সেটা কাটিয়ে তোলার দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। সেখানে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা ব্যর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনাকে নিজ হাতেই এই চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয় ও এগিয়ে নিতে হচ্ছে। আর করোনার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি যা হবে সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন সেগুলো তাকে এককভাবে করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটা বাস্তবায়ন তাঁকেই করতে হবে। অর্থাৎ শতবর্ষের এই বিশ্ব মহামারির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য শেখ হাসিনা একাই লড়ছেন। তাই সর্বোপরি বলা যায়, ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর থেকে ২০২০ সালের এই করোনাপীড়িত বিশ্ব মহামারি পর্যন্ত প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে একাই লড়তে হয়েছে। এটাই মনে হয় তাঁর ভাগ্যে লেখা, তাঁর সারাটা জীবন এভাবে একা লড়েই বাংলাদেশ নামক দেশটির মানুষের ভাগ্য বদল করতে হবে। বাঁচাতে হবে তাদের রাজনৈতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে শতবর্ষের ভয়াবহ বিশ্বমহামারির হাত থেকে।
(বাংলাট্রিবিউনে প্রকাশিত)।


 

User Comments

  • আরো