৮ মার্চ ২০২১ ১২:৩০:০৪
logo
logo banner
HeadLine
দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য * আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা * আজ পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন প্রায় ৩৭ লাখ, নিবন্ধন করেছেন ৪৯ লাখ * কমনওয়েলথে অনুপ্রেরণাদায়ী শীর্ষ ৩ মহিলা নেতার অন্যতম শেখ হাসিনা * আগামীকাল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, এবছর থেকে দিবসটি 'জাতীয় দিবস' হিসাবে উদযাপিত হবে * ০৫ মার্চ : দেশে নতুন শনাক্ত আরও ৬৩৫, মারা গেছেন ৬ জন, সুস্থ ৬৭৬ * অপরাধ যাই হোক, শিশুর সাজা ১০ বছরের বেশি নয়: হাইকোর্ট * প্রতিবেশী দেশগুলোর সমস্যা আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত : প্রধানমন্ত্রী * টিকা নিলেন প্রধানমন্ত্রী * গবেষণা ও বিজ্ঞানের বিবর্তন দেশের উন্নয়নে অপরিহার্য : প্রধানমন্ত্রী * এইচ টি ইমামের মৃত্যু, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক * ০৩ মার্চ : দেশে নতুন শনাক্ত আরও ৬১৪, মারা গেছেন ৫ জন, সুস্থ ৯৩৬ * সন্দ্বীপের ১৩টিসহ ৩৭১ ইউপি ভোট ১১ এপ্রিল * ২ মার্চ : দেশে নতুন শনাক্ত ৫১৫, মৃত্যু ৭, সুস্থ ৮৯৪ জন * বর্তমানে দেশে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ৬৬৯ *
     02,2021 Tuesday at 19:35:07 Share

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের খেসারত

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের খেসারত

আনিস আলমগীর :: পাঁচ বছর আগে ইউপি নির্বাচনের আগে বাংলা ট্রিবিউনের কলামেই আশঙ্কা করেছিলাম যে দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে বিভক্তির রাজনীতিটা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেলে জাতির জন্য খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে। পশ্চিম বাংলায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় তা-ই হয়েছে। সরকার যেন দলীয়ভিত্তিক নির্বাচনটা ট্রায়াল হিসেবে দেখেন। ফলাফল ভালো না হলে ভবিষ্যতে যাতে পদ্ধতিটা বাতিল করতে পারেন।

কিন্তু সরকার বিভক্তির রাজনীতির পরিণতি দেখেও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিল করেনি। আগামী ১১ এপ্রিল থেকে দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করেছে। দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনও চলমান আছে। পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালের ২২ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ছয় ধাপে চার হাজারের বেশি ইউপির ভোট হয়েছে দলীয় প্রতীকে

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার পরিণতিতে সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতি কতটা কলুষিত হয়ে উঠেছে সেটার উদাহরণ হতে পারে কোম্পানীগঞ্জ। বিরুদ্ধ দলের সঙ্গে সংঘর্ষের চেয়ে নিজ দলের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সঙ্গে হানাহানি করছে। গত এক দশক ধরে বিএনপি যেহেতু মাঠে প্রায় বিলুপ্ত, আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহই চোখে পড়ছে সারাদেশে। বসুরহাট পৌরসভার মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই মাস ধরে সেখানে উত্তেজনা চলছিল। নির্বাচনও হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের এক মাস পরে এসেও সংঘর্ষ থামেনি। আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে লাশ পড়েছে একজন সাংবাদিকের।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনও আগে দলীয় প্রতীকে ছিল না। কিন্তু অনেকে মত দিয়েছিলেন যে শহর কেন্দ্রিক এই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়া উচিত। আইন করে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচন হচ্ছেও। কিন্তু ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় প্রতীক না থাকলেও অলিখিত দলীয় প্রার্থী হচ্ছে এবং তাতে দলগুলো স্পষ্ট করে দলীয় প্রার্থী নেই বলছে না বলেই সংঘর্ষ হচ্ছে। মূলত ওয়ার্ড কমিশনারদের সংঘর্ষই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কলুষিত করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্তভাবে হওয়ার ধারা ভেঙে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন সংক্রান্ত পাঁচটি আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের মতো তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনেও রাজনীতি ঢুকে যাওয়ায় সমাজচিত্র আমূল বদল হয়ে গেছে। আগে নির্বাচনে আসতো সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা, এখন আসছে দলীয় ক্যাডাররা। এদের না আছে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, না আছে সমাজ নিয়ে চিন্তা। দলীয় প্রতীকে ভর করে নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আখের গোছানোর চেষ্টা সিংহভাগের।

যেহেতু মানুষ আগের থেকে রাজনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সম্পৃক্ত সে কারণে দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, তার হাতে বিকল্প প্রার্থী নেই। গণ্যমান্য, প্রভাবশালী, ভদ্রলোকেরা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছে না। কোনও রাজনৈতিক দলের হাইকমান্ডের পক্ষেই সম্ভব না কোনও একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ঠিক করে দেওয়া। ফলে দলের কাউন্সিলরদের ভোট কেনাবেচায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থী ঠিক হচ্ছে। দলের মধ্যে যোগ্য প্রার্থীও দলীয় রাজনীতির এই নোংরা প্রতিযোগিতায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা নির্বাচন করতে পারছে না। করলে বহিষ্কার হচ্ছে। নির্বাচনে যাচ্ছে দলের কাউন্সিলরদের টাকায় কিনে টিকিট পাওয়া কোনও এক ক্যাডার বা টাকাওয়ালা। সমাজে আগের মতো আর বিচার-আচার নেই, মান্যতা নেই। যে যত বেশি গুণ্ডা পোষে সে তত বেশি প্রভাবশালী, তারে সবাই সালাম দেয় বা ইজ্জত দেওয়ার ভান করে। এর অন্যরকম প্রতিশোধও নেয় জনগণ। সে কারণে দলীয় প্রার্থীদের বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে সিলেটের ‘ছক্কা ছয়ফুর’ জাতীয় লোকদের মানুষ দলবেঁধে ভোট দেয়। এবারও রাজশাহীর তানোর মুন্ডুমালা পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীদের পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন একটি কলেজের নৈশপ্রহরী সাইদুর রহমান।

এখনকার চেয়ারম্যানদের যোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা এমন তলানিতে এসেছে যে স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব নিচ্ছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। করোনাকালে ত্রাণ বিতরণ থেকে শুরু করে সব স্থানে এখন আমলারাই এসব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের থেকে ক্ষমতাবান। অথচ স্থানীয় সরকারের ঐতিহ্য এবং প্রভাবের ইতিহাস সুদীর্ঘ। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কথায় সমাজ চলতো। সিংহভাগ বিচার-আচার থানায় যাওয়ার আগে ইউনিয়ন পরিষদে শেষ হয়ে যেত।

১৮৭০ সালে ব্রিটিশের সময়ে চৌকিদারি আইন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথম স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছিল। স্থানীয় সরকারের এ প্রাথমিক স্তরটি খুবই প্রাচীন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান তার রচিত ও প্রদত্ত শাসনতন্ত্রে ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যদের দিয়েই ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ গঠন করেছিলেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ হাজার করে সর্বমোট ৮০ হাজার সদস্য নির্বাচিত হতো প্রত্যক্ষ ভোটে। তারাই ভোট দিয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, প্রাদেশিক সংসদের সদস্য, জাতীয় সংসদের সদস্য ও রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন। এ প্রথাকে বেসিক ডেমোক্র্যাসি প্রথা বলা হতো।

এর আগে সব নির্বাচন প্রত্যক্ষ ভোটেই অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৫৪ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনও শাসনতন্ত্র ছিল না। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন দিয়েই পাকিস্তান চলতো। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র গৃহীত হওয়ার পরপরই প্রত্যক্ষ ভোটে ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন ইউনিয়ন পরিষদের প্রধানকে ‘প্রেসিডেন্ট’ বলা হতো। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এই শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ছিল কিন্তু ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান দেশে সামরিক শাসন জারি করে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করে দিয়েছিলেন এবং ১৯৬২ সালে তার দেওয়া শাসনতন্ত্র বহাল হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিল।

তখন দেশে কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। রাজনীতিও নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র কোনও গণপরিষদ রচনা করেনি। এটি আইয়ুবের এক ব্যক্তির রচিত ও প্রদত্ত শাসনতন্ত্র ছিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ভাষ্য অনুসারে সাধারণ মানুষ ভোটের অধিকার প্রয়োগের উপযুক্ত ছিল না বলে তিনি প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা রহিত করে তার শাসনতন্ত্রে বেসিক ডেমোক্র্যাসি প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন।

১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র রচনা করে। এই শাসনতন্ত্র গৃহীত হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে নব-প্রণীত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে সব স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ছিল।

কোনও সময়েই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলভিত্তিক হয়নি। আগে সমাজে কিছু শক্তিশালী লোকের বিচরণ ছিল। তারাই সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করতেন। তাদের ৮০% লোক নির্দল লোক ছিলেন। চকিদার/দফাদার ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা দেখাশোনা করার জন্য কোনও লোক ছিল না। কিন্তু শক্তিশালী লোকগুলোর কারণে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকতো।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার পর এ শ্রেণির লোকগুলো বিভিন্ন কারণে উচ্ছেদ হয়ে যায়। এতে সমাজের উপকার হয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য স্থান কোনোদিন শূন্য থাকে না। ধীরে ধীরে তাদের স্থানে আরেক দল লোকের আবির্ভাব হয়। কিন্তু কমরেড আব্দুল হক, কমরেড তোয়াহা, মতিন আলাউদ্দিন, সিরাজ সিকদার, টিপু বিশ্বাস, অহিদুর রহমান, মতিন মাস্টার ও জিয়াউদ্দীন প্রমুখ কমরেডদের গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী তৎপরতায় গ্রামীণ সমাজের ক্ষমতাবান-শক্তিশালী লোকেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিপ্লবের হিড়িক পড়েছিল। বুর্জোয়া, পাতি বুর্জোয়া, মুৎসুদ্ধি এমন শব্দগুলো তখন ক্ষেতে খামারের ছড়িয়ে পড়েছিল। বিপ্লবীরা বহু চেয়ারম্যান মেম্বার হত্যা করেছে। বরিশালে ঈদের জামাতে তারা দু’জন এমপিকেও হত্যা করেছিল। রাতের অন্ধকারে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক স্লোগান শোনা যেত কিন্তু বিপ্লব ও বিপ্লবীরা কেউই দীর্ঘজীবী হয়নি। সমাজটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজটা পুনর্গঠনের জন্য সমাজ-সংহতিরই প্রয়োজন ছিল বেশি।
সমাজের সংহতি যেটুকু অবশিষ্ট ছিল এখন সেটাও শেষ। আগে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের, এক বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির বিরোধ ছিল। এখন ঘরে ঘরে বিরোধ, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ শুরু হয়েছে। দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা আসার পর বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি উল্লেখযোগ্য তেমন কোনও বিরোধিতা করেনি; বরং তারা নিজেরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছে।

আশা করছি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে সমাজকে ধ্বংস করে দেওয়ার আয়োজন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর হুঁশ ফিরে আসবে। ( বাংলা্ট্রিবিউনে প্রকাশিত)।

লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট, ইরাক আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। anisalamgir@gmail.com

User Comments

  • কলাম